মেসওয়াকে আমল করি

একটি সুন্নাত আমল, যা প্রতিটি মুসলিমের করা উচিৎ। আফসোস শুধু মাত্র মাদ্রাসার আলেম/শিক্ষার্থী ছাড়া, বেশির ভাগ সাধারণ মুসলিমই এই আমল নিয়ে বেখবর। আর সেই আমল হচ্ছে “মেসওয়াক” করা।

মেসওয়াক নিয়ে কয়েকটি হাদিস পেশ করা হল–
১. আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
السِّواكُ مَطهَرةٌ للفمِ مَرضاةٌ للرَّبِّ
মিসওয়াকের মাধ্যমে মুখের পবিত্রতা অর্জিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। (নাসায়ী ৫)
২. আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ وُضُوءٍ
যদি আমি আমার উম্মতের উপর কঠিন মনে না করতাম তাহ’লে প্রত্যেক ওযূর সাথে তাদেরকে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম। (বুখারী ২/৩০৮)
৩. আবু উমামা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
ما جاءَني جبريلُ قطُّ إلَّا أمرَني بالسِّواكِ حتَّى لقد خَشيتُ أن أُحْفيَ مُقدَّمَ فَمي
এমনটি কখনো হয়নি যে, জিবরাইল আ. আমার নিকট এসেছেন আর আমাকে মিসওয়াকের আদেশ দেন নি। এতে আমার আশংকা হচ্ছিল যে, মিসওয়াকের কারণে আমার মুখের অগ্রভাগ ছিলে না ফেলি। (আল মুযামুল কাবীর লিত তবারানী ৭৮৪৭, মুসনাদে আহমদ ২২২৬৯)।

মহানবী (সাঃ) এর শেষ আমলও কিন্তু এই মেসওয়াক ছিল।
আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার ঘরে আমার পালার দিনে এবং আমার গণ্ড ও সীনার মধ্যস্থলে থাকা অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ হলে আমাদের মধ্যকার কেউ দু’আ পড়ে তাঁকে ঝাড়ফুঁক করতেন। আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ঝাড়ফুঁক করার জন্য তাঁর কাছে গেলাম। তখন তিনি তাঁর মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেন, উচ্চে সমাসীন বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই), উচ্চে সমাসীন মহান বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই)। এ সময় আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ) আগমন করলেন। তাঁর হাতে মিসওয়াকের একটি তাজা ডাল ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন সেদিকে তাকালেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, তাঁর [নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)]-এর মিসওয়াকের প্রয়োজন। তখন আমি সেটি নিয়ে চিবালাম, ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করলাম এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তা দিলাম। তখন তিনি এর দ্বারা এত সুন্দরভাবে দাঁত পরিস্কার করলেন যে, এর আগে কখনও এরূপ করেননি। তারপর তা আমাকে দিলেন। এরপর তাঁর হাত ঢলে পড়ল অথবা রাবী বলেন, তাঁর হাত থেকে ঢলে পড়ল। আল্লাহ তা’আলা আমার থুথুকে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর থুথুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। তার এ দুনিয়ার শেষ দিনে এবং আখিরাতের প্রথম দিনে। [৮৯০] (আ.প্র. ৪০৯৮, ই.ফা. ৪১০১)
আশা করি এ থেকে বুঝতেই পারছেন যে, মেসওয়াক করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আসুন! মেসওয়াকের জন্য কেমন ডাল বেঁছে নিতে হবে তা জেনে নেইঃ

রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাইতুন ও খেজুর গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করেছেন। তাই এই দুটো হলে উত্তম। এছাড়া তিক্তস্বাধ যুক্ত গাছের ডাল হলেও ভাল। মেসওয়াক কাচা ও নরম গাছের ডাল হওয়া উচিত, এতে মেসওয়াকে বাড়তি ফায়দা হাসিল হয়।
মেসওয়াক নিজ হাতের আঙ্গুলের মত মোটা ও এক বিঘত পরিমাণ লম্বা হওয়া উচিত। এতে মেসওয়াক করতে যেমন সুবিধা হবে তেমনি বেশী ফায়দাও পাওয়া যাবে।
মেসওয়াক কখন করব?
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে উযুতে হাত ধোয়ার পর কুলি করার পূর্বে মেসওয়াক করা উত্তম। তবে কোন কোন আলিম উযুর পূর্বে মেসওয়াক করার কথাও বলেছে। উযুর সময় ছাড়াও যে কোন সময় মেসওয়াক করা যাবে।
ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর ও ঘুমানোর পূর্বে, নামাজের আগে, মজলিসে উপস্থিত হবার পূর্বে, কুরআন ও হাদীস পাঠের পূর্বে, খাওয়ার পর মেসওয়াক করা মুস্তাহাব।

মেসওয়াক করার পদ্ধতিঃ
মেসওয়াক ধরার পদ্ধতি হল, ডান হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলি মেসওয়াকের নিচে থাকবে। মধ্যমা ও তর্জনী উপরে ও বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচে রেখে মেসওয়াক ধরা। এতে করে মুখের ভিতর ভালভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মেসওয়াক করা যায়। এপদ্ধতিটি হযরত ইবনে মাসউদ রাযি থেকে বর্ণিত আছে।

মেসওয়াক করার মাসনূন পদ্ধতি হল, মুখের ডান দিক থেকে শুরু করা এবং উপর থেকে নিচে মেসওয়াক করা। আড়াআড়ি ভাবে না করা। মেসওয়াক করার সময় দাঁতের ভিতর বাহির সহ মেসওয়াক করা এবং জিহবাও গোড়া পর্যন্ত মেসওয়াক করা।

মেসওয়াকের উপকারিতা:
আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) মোনাব্বেহাত কিতাবে মেসওয়াকের বিশটি উপকারিতা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে সর্বনিম্ন উপাকারিতা হলো ময়লা দূর করা, আর সর্বোচ্চ উপকারিতা হলো মৃত্যুর সময় কালেমা স্মরণ হওয়া। এজন্যই হজরত আবু দারদা (রা.) বলেন, তোমরা নিজেদের জন্য মেসওয়াক করা অপরিহার্য করে নাও এবং এ ব্যাপারে উদাসীন হয়ো না। কেননা মিসওয়াকে রয়েছে চব্বিশটি উপকারিতা।
সবচেয়ে বড় ১০টি উপকার হল
(১) মেসওয়াক করলে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টি হন
(২) নামাজের সওয়াব সত্তর গুণ বৃদ্ধি পায় (কোনো কোনো হাদীসে সত্তর ও কোনো হাদীসে সাতাত্তর বলা হয়েছে)।
(৩) স্বচ্ছলতা আসে।
(৪) মুখ সুঘ্রাণ হয়
(৫) দাঁতের মাড়ি শক্ত হয়।
(৬) মাথা ব্যথা সেরে যায়।
(৭) চোয়ালের ব্যথা দূর হয়।
(৮) ফেরেশতাগণ মোসাফাহা করেন।
(৯) চেহারা উজ্জ্বল হয়।
(১০) দাঁত উজ্জ্বল হয়। নেহায়াতুল আমল কিতাবে আছে।

আসুন! আজকে থেকেই মেসওয়াককে আমাদের জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *